চট্টগ্রাম, , বৃহস্পতিবার, ২১ জানুয়ারী ২০২১

ছাত্রলীগ নেতা ইফতির জবানবন্দিতে আবরার হত্যাকাণ্ডের লোমহর্ষক বর্ণনা

প্রিয়সংবাদ ডেস্ক  ২০১৯-১০-১১ ১২:১৪:২৬   বিভাগ:

 

প্রিয় সংবাদ ডেস্ক:: বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যায় নিজের জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে বৃহস্পতিবার আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন ছাত্রলীগ নেতা ইফতি মোশাররফ সকাল। বৃহস্পতিবার বিকেলে ঢাকা মহানগর হাকিম সাদবির ইয়াসির আহসান চৌধুরী তার জবানবন্দি রেকর্ড করেন। হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশ নেয়া ইফতি মোশাররফ সকাল বাংলাদেশ ছাত্রলীগ বুয়েট শাখার সমাজসেবাবিষয়ক উপসম্পাদক। জবানবন্দি গ্রহণের পর আদালত তাকে কারাগারে পাঠিয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আদালতে দেয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে এই বীভৎস হত্যাকাণ্ডের বর্ণনা দিয়েছেন বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের নেতা ইফতি মোশাররফ সকাল। তার কক্ষেই গত ৬ অক্টোবর রাতে শিবিরকর্মী সন্দেহে পিটিয়ে হত্যা করা হয় ইলেকট্রনিকস অ্যান্ড ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র আবরার ফাহাদকে। এই ঘটনায় প্রত্যক্ষভাবে অংশ নেন ইফতি।

আবরার হত্যার ঘটনায় বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ১৬ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে ইফতিই প্রথম আসামী, যিনি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিলেন। এদিকে ঘটনাটি তদন্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ছাত্রলীগ নেতা ইফতিই আবরারকে তার কক্ষ থেকে ডেকে আনা থেকে শুরু করে পুরো হত্যাকাণ্ডের বর্ণনা দেন।

বৃহস্পতিবার আদালতে দেয়া জবানবন্দীতে হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশ নেয়া ইফতি বলেছেন, গত ৪ অক্টোবর বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মেহেদী হাসান ওরফে রবিন শেরেবাংলা হল ছাত্রলীগের একটি মেসেঞ্জার গ্রুপে একটি নির্দেশনা দেন। নির্দেশনায় বলা হয়, আবরার শিবির করে, তাকে ধরতে হবে। এরপর মেসেঞ্জার গ্রুপে সাড়া দেন বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের আইনবিষয়ক উপসম্পাদক অমিত সাহা। আবরার তখন বাড়িতে থাকায় তিনি ইফতিকে বলেন, ‘ওকে বাড়ি থেকে ফিরতে দেন।’

ইফতি আদালতকে বলেন, এরপর গত ৬ অক্টোবর আবরার ফাহাদ বাড়ি থেকে ফেরার পর একইদিন রাত আটটার কিছু পর আবরারকে হলের ২০১১ নম্বর কক্ষে নিয়ে আসা হয়। এসময় আবরারের দুটি মোবাইল ফোন ও ল্যাপটপও সঙ্গে আনা হয়। ২০১১ নম্বর কক্ষে আনার পর ইফতির রুমমেট বুয়েট ছাত্রলীগের উপদপ্তর সম্পাদক মুজতবা রাফিদ একটি মোবাইল ফোন এবং মেকানিক্যাল ইঞ্জনিয়ারিং বিভাগের তৃতীয় বর্ষের খন্দকার তাবাখখারুল ইসলাম ওরফে তানভীর আরেকটি মোবাইল ফোন চেক করেন। একই বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের মুনতাসির আল জেমি আবরারের কাছ থেকে তাঁর ল্যাপটপের পাসওয়ার্ড নিয়ে খুলে চেক করেন।

জবানবন্দিতে ইফতি আরো জানান, আবরারের ডিভাইসগুলো তারা যখন চেক করছিলেন, তখন মেহেদী হাসান এবং বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের ক্রীড়াবিষয়ক সম্পাদক মো: মেফতাহুল ইসলাম ওরফে জিয়ন (নেভাল আর্কিটেকচার মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র) কক্ষে আসেন। এসময় মেহেদী বুয়েটে কারা কারা শিবির করে তা আবরারের কাছ থেকে বের করার জন্য তাদেরকে নির্দেশ দেন। এ সময় মেহেদী বেশ কয়েকটি চড় মারেন আবরারকে।

ইফতি বলেন, ওই কক্ষে তখন ক্রিকেটের কোনো স্টাম্প ছিল না। আবরারকে পেটানোর জন্য বাইরে থেকে তখন কেউ একজন ওই কক্ষে স্টাম্প নিয়ে আসেন। একপর্যায়ে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র সামসুল আরেফিন ওরফে রাফাত স্টাম্প এনে তার (ইফতি) হাতে দেন। এসময় আবরারের কাছ থেকে কথা বের করার জন্য স্টাম্প দিয়ে চার-পাঁচটি আঘাত করেন ইফতি। এতে স্টাম্পটি ভেঙে যায়। এরপর বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের তথ্য ও গবেষণাবিষয়ক সম্পাদক অনিক সরকার (মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র) স্টাম্প দিয়ে আবরারের হাঁটু, পা, পায়ের তালু ও বাহুতে বেধড়ক পেটাতে থাকেন। এতে আবরার উল্টাপাল্টা কিছু নাম বলতে শুরু করেন। তখন মেফতাহুল আবরারকে চড় মারেন এবং স্টাম্প দিয়ে হাঁটুতে পেটান। এ সময় মেহেদী মুঠোফোনে বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক রাসেলের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।

ইফতি আদালতকে বলেন, একপর্যায়ে রাত সাড়ে ১০টার দিকে তিনি ক্যানটিনে খেতে যান। মিনিট বিশেক পর ফিরে এসে দেখেন, আবরার অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তিনি মেঝেতে শুয়ে আছেন। তিনি তখন আবরারকে ধমক দিয়ে উঠে দাঁড় করান। কয়েকটি চড় মারেন। ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র মুজাহিদুর রহমান তখন কক্ষে থাকা স্কিপিং রোপ দিয়ে আবরারকে মারেন। এরপর ইফতি আবারো স্টাম্প দিয়ে আবরারের হাঁটু ও পায়ে আঘাত করেন। তাবাখখারুল তখন চড়-থাপ্পড় মারেন।

ইফতি আরো বলেন, এরপর রাত ১১টার দিকে অনিক সরকার আবার ২০১১ নম্বর কক্ষে আসেন। হঠাৎ অনিক স্টাম্প দিয়ে সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগ করে আবরারকে এলোপাতাড়ি শতাধিক আঘাত করেন। এসময় অনিক খুবই অনিয়ন্ত্রিতভাবে আবরারকে মারতে থাকেন। অনিকের পেটানো দেখে সবাই (উপস্থিত হত্যাকারীরা) ভয় পেয়ে যান। এরপর আনুমানিক রাত ১২টার পর আবরারকে মারা থামিয়ে কক্ষের বাইরে যান অনিক।

ইফতি বলেছেন, মারধরের এই পর্যায়ে আবরার অসুস্থ হয়ে পড়ে ছিলেন। এই সময় আবরার জানান যে, তাঁর শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। তখন আবরারের মাথার নিচে দুটি বালিশ দেন তিনি (ইফতি)। এর কিছুক্ষণ পরই আবরার বমি করেন। মুঠোফোনে বিষয়টি অনিককে জানানো হলে তিনি আবরারকে গোসল করিয়ে হাতে-পায়ে মলম লাগিয়ে দিতে বলেন। এ সময় আবরার দ্বিতীয়বার বমি করেন। তখন আবরারের কক্ষ থেকে তাঁর কাপড়চোপড় নিয়ে আসা হয়। এ সময় ছাত্রলীগ নেতা মেহেদী আবরারকে দেখে বলেন, ‘ও নাটক করছে’।

ইফতি বলেন, এরপর আবরারকে ২০১১ নম্বর কক্ষ থেকে ২০০৫ নম্বর কক্ষে নিয়ে শুতে দেয়া হয়। এ সময় অমিত সাহা খুদে বার্তা পাঠিয়ে সবকিছু জানতে চান এবং আবরারকে আরো মেরে আরো তথ্য বের করতে নির্দেশ দেন। প্রতিউত্তরে আবরারের অবস্থা খুব খারাপ জানালে অমিত সাহা তাঁকে (আবরারকে) হল থেকে বের করে দিতে বলেন। এর কিছুক্ষণ পর ছাত্রলীগ নেতা মেহেদী ও অনিক আবারো ২০০৫ নম্বর কক্ষে আসেন। আবরারকে দেখে তারা বলেন, ‘ও ঠিক (সুস্থ) আছে।’ এরপর তারা চলে যান।

ইফতি আরো বলেন, এ সময় আবরার আবারো বমি করেন। মেহেদী তখন আবরারকে পুলিশের হাতে দেয়ার জন্য নিচে নামাতে বলেন। এসময় ১৭ ব্যাচের ছেলেরা আবরারকে নিচে নামানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়। পরে তোশকসহ আবরারকে ধরে দোতলা ও নিচতলার সিঁড়ির মাঝামাঝি অংশে নামিয়ে রাখেন। তখন আবরার বলছিলেন যে তাঁর খুব খারাপ লাগছে।

এসময় বুয়েট ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক রাসেল নিচে নেমে হলের প্রধান ফটকে অপেক্ষারত পুলিশের সঙ্গে কথা বলছিলেন। এ সময় মুনতাসির দৌড়ে এসে বলেন, আবরারের হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসছে। ইফতি তাকে (মুনতাসির) মালিশ করতে বলেন। ইসমাইল ও মনির তখন অ্যাম্বুলেন্সে ফোন দেন। অ্যাম্বুলেন্স আসতে দেরি হওয়ায় তামিম মোটরসাইকেল নিয়ে বুয়েট মেডিকেলের চিকিৎসক নিয়ে আসেন। চিকিৎসক আসার পরপরই অ্যাম্বুলেন্স আসে। চিকিৎসক সিঁড়িতে আবরারকে দেখে বলেন, ‘ও মারা গেছে।’ এই ঘটনার পর ইফতি একটি কক্ষে গিয়ে শুয়ে থাকেন। সেখান থেকে পরদিন সকালে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে।

এর আগে রিমান্ডে থাকা অবস্থায় ইফতি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে রাজি হলে বৃহস্পতিবার তাকে আদালতে হাজির করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) ইন্সপেক্টর মো: ওয়াহিদুজ্জামান।



ফেইসবুকে আমরা